সর্বশেষ খবর

৩২ বছরে ছুটি নিয়েছেন মাত্র ১২দিন ! শিক্ষকতা পেশার ‘আইডল’ রাউজানের বনমালী দাশ

জাহেদুল আলম । রাউজানটাইমস
বয়স ৫৯। গড়নটা রুগ্ন, দেখতে সাদাসিদে। শিাগত পেশায় এক বড় মনের মানুষ। ৩২ বছর ছুঁই ছুঁই শিাগতা জীবনের শেষ ১৪ বছর নৈমিত্তিক কোন ছুটি কাটাননি। চাকুরির প্রথম ১৮ বছরও নৈমিত্তিক ছুটি কাটানোর সংখ্যাও একেবারে নগণ্য। এই সময়ে তিনি ছুটি নিয়েছেন মাত্র ১২ দিন!। সামনের ডিসেম্বর মাসে মহান শিাগত পেশা থেকে অবসর গ্রহন করতে যাচ্ছেন। বাকী এই কয়েক মাসেও অতিরিক্ত ছুটি কাটাতে চাননা। এমন এক আদর্শবান শিকের দেখা মিলেছে রাউজান উপজেলার পাঁচখাইন দরগাহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়য়ে। তার নাম বনমালী দাশ। তিনি ওই স্কুলের raozan pic-adarsa-2সহকারী প্রধান শিক। বিগত ১৪ বছর ধরে নিজের প্রাপ্য ছুটি গ্রহন না করে প্রায় প্রতিদিন স্কুলে এসে পাঠদান করছেন এই শিক। এমনকি ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর দিনও তিনি স্কুলে এসে কাস নিয়েছেন। এমন দৃষ্টান্ত দেশে আর আছে কিনা জানা নেই খোদ উপজেলা শিা কর্মকর্তা ও তার সহকর্মিদের। শুধু তাই নয়, শিশুশিা বিস্তারেও তার চেষ্ঠা, আগ্রহ অতুলনীয়। ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে আসার যাওয়া সর্ম্পকে তদারকি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা সৃষ্ঠিসহ শিামূলক নানান কাজেও তিনি রাখেন ভূমিকা। শিা বিস্তারে প্রবল আগ্রহের কারনে তিনি এখন তার সহকর্মিসহ সাধারন মানুষের কাছে সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। শিকতা পেশার শেষ প্রান্তেও নিজের কর্মের প্রতি নিরলস বনমালী দাশ এখন স্কুলের অন্যান্য শিক ও স্থানীয়দের মাঝে একজন ‘আইডল’। শিায় তার এমন ত্যাগ দেখে মুগ্ধ অভিভাবক এবং স্থানীয় জনসাধারনও। কিন্তু দুর্ভাগ্য বনমালীর। এমন এক রেকর্ডের পরও এযাৎ তার কপালে জুটেনি কোন স্বীকৃতি।
উপজেলা শিা কর্মকর্তা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন ‘একজন শিক চাইলে বাৎসরিক বিশ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি কাটাতে পারেন। শিক বনমালী দাশ তার চাকুরীর ৩২ বছরে ৬শ ৪০ দিন ছুটি কাটাতে পারতেন। কিন্ত তিনি তার শিকত জীবনের এই পর্যন্ত ছুটি নিয়েছেন মাত্র ১২ দিন। তাও চাকুরির প্রথম ১৮ বছরের মধ্যে। শেষের টানা ১৪ বছর তিনি কোন নৈমিত্তিক ছুটিই নেননি। তার মতো নিঃস্বার্থ, নিবেদিতপ্রাণ শিক আর একটি দেশে আছে কিনা আমার জানা নেই। তিনি শিক সমাজের অহংকার।’ বনমালী দাশের এমন দায়িত্বশীলতার কারনে কোন স্বীকৃতি না পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও তাকে আমরা একটি অনুষ্ঠানে শিার্থীদের দাঁড় করিয়ে স্যালুট প্রদান করেছি। তার ন্যায়নিষ্টতা এবং অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরার জন্যে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ করে দেয়া হয়। তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানোর প্রয়োজন মনে করি।’ পাঁচখাইন দরগাহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক দিপস কুমার বড়ুয়া বলেন ‘টানা ১৪ বছর ছুটি না কাটানোর ঘটনা এদেশে বিরল। তিনি তার ভাই দোলন দাশ মারা যাওয়ার পর দাহ করেই স্কুলে কাস নিতে চলে আসেন। দেশের সাড়ে ৪ লাখ শিকের মধ্যে এমন আদর্শ শিক আর আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। শিক হিসেবেও তিনি খুব ভালো। সেই সকালে স্কুলে আসেন, ফিরেন বিকেলে ছুটির সময়ে। শিায় নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে করেননি বিয়ে।’
চিরকুমার শিাপ্রীতি বনমালী দাশ বলেন ‘নিজের দায়িত্ব ও শিাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি আমি। একারনেই আমি ছুটি নেয়নি।’ তিনি বলেন ‘শিকতা জীবনের ২০০০ সালে পাঁচখাইন দরগাহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করি। তখন স্কুলটি সি গ্রেডে ছিল। শিার মান ও পরিবেশ সৃষ্ঠি হয়েছে ধাপে ধাপে। স্কুলে এখন শিশু পার্ক, তোরণসহ অনেক উন্নয়ন হয়েছে। একারনে ধীরে ধীরে সি গ্রেড থেকে বি এবং বর্তমানে এই স্কুল এ গ্রেডে উন্নীত হয়েছে। স্কুলের পাশের হারও এখন শতভাগ।’ স্কুলের শিক ওয়াশিংটন দেবনাথ বলেন ‘বনমালী দাশ নীতি পরায়ন একজন মানুষ। যেকোন অনুষ্ঠানে কিংবা স্থানে তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন।’ এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিশুশিার প্রসারেও তিনি কাজ করেন। তিনি বাড়ি বাড়ি শিশুদের স্কুলে পাঠানো এবং স্কুলে আসা যাওয়া সম্পর্কে তদারকি করেন। শিার উন্নয়নে নানা ভূমিকা পালন করেন এলাকায়। জানা গেছে, বনমালী দাশ উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের গশ্চি গ্রামের ব্রাণ দাশ পাড়ার মৃত হীরা লাল দাশ ও মৃত রানী বালা দাশের ছেলে। ৬ ভাইয়ের মধ্যে বড় দুই ভাই গৌরাঙ্গ প্রসাদ দাশ ও রামকৃষ দাশ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধকালীন সময়ে শহীদ হন। পরবর্তিতে অপরাপর ভাইয়েরাও মারা যান। বেঁচে আছেন শুধু বনমালী দাশ। উল্লেখ্য যে বনমালী দাশ গত ১৯৮৫ সালের জানুয়ারী মাসে সহকারী শিক পদে শিকতা জীবন শুরু করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসী আটক করে প্রশংসায় ভাসছেন রাউজান থানার ওসি কেফায়েত

নেজাম উদ্দিন রানা, রাউজান : রাউজান উপজেলার পূর্ব রাউজানের রাবান বাগান সংলগ্ন ...